প্রাথমিক বিদ্যালয় খোলার প্রস্তুতি নিতে নির্দেশনা দিলো সরকার

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় খোলার প্রস্তুতি নিতে একগুচ্ছ নির্দেশনা দিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। মঙ্গলবার এ সংক্রান্ত এক নির্দেশনায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে বিদ্যালয় পুনরায় চালু করতে প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়।

উপসচিব শামীম আরা নাজনীন স্বাক্ষরিত নির্দেশনায় বলা হয়, বিদ্যালয় চালুর আগে নির্দেশিকা মেনে প্রস্তুতি নিতে হবে। প্রস্তুতি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে লিফলেট, পোস্টার ইত্যাদির খসড়াসহ একটি উপস্থাপনা তৈরি করতে সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ জানানো হয়।

নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়,

১) বিদ্যালয় আবার চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার নানাবিধ মাত্রা সম্পর্কে সুস্পষ্ট সরকারি নির্দেশনা দেওয়া হবে।

২) বিদ্যালয় কার্যক্রম পুনরায় চালু করার আগে বিদ্যালয় পরিচালনার জন্য পরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয় অর্থায়নের ব্যবস্থা নিতে হবে।

৩) বিদ্যালয় পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধি পদক্ষেপ সম্পর্কে বিস্তারিত সুস্পষ্ট, সহজবোধ্য ও শিশুবান্ধব ভাষায় প্রোটোকল প্রণয়ন করতে হবে। শারীরিক দূরত্ব বাজায় রাখা, হাত ধোয়া, হাঁচি-কাশি বিষয়ক শিষ্টাচার, সুরক্ষা সরঞ্জামের ব্যবহার, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং নিরাপদ খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুত করার অভ্যাস গড়ে তোলা বিষয়ক তথ্য ও নির্দেশনা থাকবে।

৪) নিরাপদ বিদ্যালয় পরিচালনার লক্ষ্যে বিদ্যালয় খোলার আগে প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। সে লক্ষ্যে বিদ্যালয়ে শ্রেণি পাঠদান শুরু হওয়ার অন্তত ১৫ দিন আগে বিদ্যালয়গুলো শিক্ষক ও কর্মচারীদের জন্য খুলে দেওয়া হবে।

৫) বিদ্যালয় চলাকালীন পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধি পদক্ষেপ সম্পর্কে বিস্তারিত সুস্পষ্ট, সহজবোধ্য ও শিশুবান্ধব ভাষায় প্রোটোকল প্রণয়ন করতে হবে। শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা, হাত ধোয়া, হাঁচি-কাশি বিষয়ক শিষ্টাচার, সুরক্ষা সরঞ্জামের ব্যবহার, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত পরিবেশ পরিষ্কার রাখা এবং নিরাপদ খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুতের অভ্যাস গড়ে তোলা।

৬) সুস্থতা ও সুরক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে স্বাস্থ্য সূচকগুলো সক্রিয়ভাবে মনিটর করতে হবে। শিখন-শোখানো পদ্ধতিকে আরও গতিশীল করবে হবে, দূরশিক্ষণসহ মিশ্র শিখন-শেখানো পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। রোগ প্রতিরোধে সংক্রমণ এবং প্রতিরোধ সম্পর্কিত তথ্য পাঠে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

৭) শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যোগাযোগ ও সমন্বয় প্রক্রিয়া এবং কৌশলগুলোকে আরও জোরদার করতে হবে, যাতে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্থানীয় জনগণ, অভিভাবক ও শিশুদের সম্পৃক্ততা ও মতবিনিময় বাড়ানো যায়।

প্রয়োজনীয় কার্যক্রম

১) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জারিকৃত নির্দেশনা ও গাইডলাইন অনুসরণ করা হবে। করোনাভাইরাস পরিস্থিতি মোকাবেলা ও সংক্রমণ রোধে প্রধানমন্ত্রীর ৩১ দফা নির্দেশনা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ ও প্রাথমিক অধিদফতর থেকে পাঠানো সকল নির্দেশনা ও পরামর্শ যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে।

এছাড়া, বিদ্যালয় চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে নিরাপদ এলাকা ও পরিস্থিতি বিবেচনায় এলাকাভিত্তিক বিদ্যালয় চালু করা যেতে পারে। করোনা সংক্রমণ বিবেচনায় কোনও এলাকা সরকার রেড জোন হিসেবে ঘোষণা করলে সে এলাকায় বিদ্যালয় খোলা রাখা যাবে না।

২) প্রয়োজনীয় কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য বাজেট প্রণয়ন ও অর্থায়নের পরিকল্পনা করতে হবে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আগাম অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে।

৩) বিদ্যালয় অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা ও জীবাণুমুক্তকরণ, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা, হাত ধোয়া, হাঁচি-কাশি বিষয়ক শিষ্টাচার, সুরক্ষা সরঞ্জামের ব্যবহার, অসুস্থদের জন্য করণীয় এবং নিরাপদ খাদ্য প্রস্তুতকরণের অভ্যাস গড়ে তোলার বিষয়ে শিক্ষক/শিক্ষার্থী/কর্মচারী ও অভিভাবকদের জন্য তথ্য ও নির্দেশনা সংবলিত পোস্টার, লিফলেট প্রস্তুত, বিতরণ করতে হবে। এসব নির্দেশনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে প্রচার করা যেতে পারে। শিশুদের স্কুলে আনার জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে উদ্বুদ্ধকরণের ব্যবস্থা নিতে হবে।

কোভিড-১৯ সংক্রমণ, লক্ষণ, জটিলতা ও প্রতিকারের উপায়গুলো বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, এসএমসি, পিটিআই ও সর্বসাধারণের জ্ঞাতার্থে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ অনুমোদিত স্বাস্থ্যবিধি, পোস্টার/লিফলেটের মাধ্যমে প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ের মাধ্যমে স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা যেতে পারে।

প্রতিটি ইউনিটের জবাবদিহি নিশ্চিত করাসহ কেন্দ্র থেকে মাঠ পর্যায় পর্যন্ত কর্মকর্তা, প্রধান শিক্ষক, সহকারী শিক্ষক ও পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের করণীয় সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে তা ছাপিয়ে বিতরণ করতে হবে। শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং বিদ্যালয়ের পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধি বিষয়ে প্রশাসনিক কর্মী ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে। এছাড়া পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের জীবাণুমুক্তকরণ সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং যথাসম্ভব ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম প্রদান করতে হবে।

৪) শিক্ষক, শিক্ষার্থী, ও কর্মচারীদের সার্বক্ষণিক হাত ধোয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য পর্যাপ্ত নিরাপদ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। হাত ধোয়ার সময় যাতে শিক্ষক/শিক্ষার্থীদের জটলা না তৈরি হয় সেভাবে বিদ্যালয়ভিত্তিক পানির ট্যাপের অবস্থান ও সংখ্যা নির্ধারণ করতে হবে।

৪.১) যেখানে সম্ভব হবে সেসব জায়গায় রানিং ওয়াটারের ব্যবস্থা করতে হবে। ছেলে ও মেয়েদের জন্য আলাদা শৌচাগার স্থাপন বা সম্প্রসারণ করতে হবে। মেয়ে শিক্ষার্থীদের ঋতুকালীন সময়ে স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখতে হবে।

৪.২) বিদ্যালয় খোলার অব্যবহিত পূর্বে অবশ্যই বিদ্যালয় প্রাঙ্গণসহ শ্রেণিকক্ষ ও টয়লেটগুলো স্বাস্থ্যসম্মত ও জীবাণুমুক্ত করতে হবে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় জীবাণুনাশক, সাবানসহ অন্যান্য পরিচ্ছন্নতা উপকরণ সংগ্রহ করতে হবে।

৪.৩) বিদ্যালয়ের অফিসকক্ষ, শ্রেণিকক্ষ, সর্বসাধারণ কর্তৃক ব্যবহৃত হয় এমন জায়গাসহ অন্যান্য জায়গার মেঝে ও ঘরের দরজার হাতল, সিঁড়ির হাতল, বেঞ্চ, এবং যেসব বস্তু বারবার ব্যবহৃত হয় সেসব বস্তুর তল/পৃষ্ঠ পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করতে হবে। এ বিষয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে যথাযথ প্রশিক্ষণ প্রদান ও সচেতন করতে হবে।

৪.৪) প্রতিদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চত্বরের আবর্জনা পরিষ্কার এবং আবর্জনা সংরক্ষণকারী পাত্র জীবাণুমুক্ত করতে হবে। প্রতিবার টয়লেট ব্যবহারের পর অবশ্যই সাবান দ্বারা হাত জীবাণুমুক্ত করতে হবে। এ বিষয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে যথাযথ প্রশিক্ষণ প্রদান ও সচেতন করতে হবে।

৪.৫) অসুস্থ শিক্ষক/শিক্ষার্থী/কর্মচারী এবং সন্তানসম্ভবা শিক্ষিকাদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি থেকে বিরত থাকতে হবে। অসুস্থ সন্তানকে বিদ্যালয়ে না পাঠানোর জন্য অভিভাবকগণকে অনুরোধ করতে হবে। অসুস্থতাজনিত অনুপস্থিতির কারণে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী যেন শ্রেণি মূল্যায়নে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে বিষয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিশেষভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

৪.৬) শিক্ষক, কর্মচারী এবং শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলকভাবে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। এ সকল বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। লিফলেট/পোস্টার/সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সচেতন করতে হবে।

৪.৭) যাদের পক্ষে সম্ভব তারা যেন সহজভাবে কাপড়ের তৈরি মাস্ক (৩ লেয়ার কাপড়ের) বানাতে পারেন তার সচিত্র বিবরণ দেওয়া যেতে পারে। স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কিত তথ্যাদি ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর ভাষায় এবং ব্রেইলের মাধ্যমে সহজলভ্য করে তুলতে হবে এবং অবশ্যই ব্যবহৃত ভাষা শিশুবান্ধব হতে হবে। প্রয়োজনবোধে এ সকল বিষয়ে ছোট ছোট তথ্যচিত্র নির্মাণ করে প্রচার করা যেতে পারে।

৪.৮) বিদ্যালয় কার্যক্রম শুরু, সমাপ্তি ও মিড-ডে মিল এর সময়সূচি এমনভাবে সাজিয়ে নিতে হবে যাতে শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের জটলা না তৈরি হয়। বিদ্যালয়ের অবকাঠামো এবং শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বিবেচনা করে একাধিক শিফট কিংবা সপ্তাহের একেকদিন একেক শ্রেণির বা একাধিক শ্রেণির পাঠদানের ব্যবস্থা রেখে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ স্থানীয়ভাবে পরিকল্পনা প্রণয়ন করবেন, যাতে শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিত করা যায়। পাঠ পরিকল্পনায় পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। মাঠ পর্যায়ে উপজেলা/থানা শিক্ষা কর্মকর্তারা উপরোক্ত পরিকল্পনা অনুমোদন করবেন এবং উপজেলা/থানা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট ক্লাস্টারের বিদ্যালয়গুলোর পরিকল্পনা প্রণয়নে সহায়তা ও বাস্তবায়নের তদারকি করবেন।

৫) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রবেশ পথে শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে শিক্ষক, কর্মচারী, শিক্ষার্থী এবং বহিরাগতদের শারীরের তাপমাত্রা পরিমাপ করতে হবে। এ লক্ষ্যে বিদ্যালয় খোলার আগেই প্রয়োজনীয় সংখ্যক নন-কন্টাক্ট থার্মোমিটার সংগ্রহ করতে হবে। যাদের তাপমাত্রা বেশি পাওয়া যাবে তাদের বিদ্যালয়ে প্রবেশ থেকে বিরত রাখেতে হবে।

৫.১) হোস্টেলে থাকাকালীন শিক্ষার্থীরা শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখবে। খাদ্য গ্রহণের সময় দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। কমপক্ষে ১ মিটার শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে খাবার গ্রহণ এবং সম্পূর্ণ নিজস্ব থালা বাসন বা ওয়ানটাইম থালা বাসন ও পানির পাত্র ব্যবহার করতে হবে। থালা বাসন এবং পানির পাত্র পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করতে হবে। প্রতিবার পরিবেশনের পর পুনরায় ব্যবহারযোগ্য থালা-বাসন ও পানির পাত্র জীবাণুমুক্ত করতে হবে।

উল্লেখ্য, মহামারির কারণে গত ১৭ মার্চ থেকে দীর্ঘ প্রায় ৬ মাস দেশের সব ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। এই ছুটির মেয়াদ ৩ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এ অবস্থায় সংসদ টিভি, বেতার এবং অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *